৯ মার্চ, কায়রো, মিশর:
ইলমের পবিত্র কেন্দ্র, জ্ঞানের কাবা খ্যাত মিশরের ঐতিহ্যবাহী আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি (ডক্টরেট) ডিগ্রি অর্জন করেছেন চট্টগ্রামের হাটহাজারীর কৃতি সন্তান ড. মুহাম্মাদ মুশাররাফ হুসাইন বিন মুহাম্মাদ নূরুল হক। দীর্ঘ অধ্যবসায়, সাধনা ও গবেষণার পথ পেরিয়ে তাঁর এই অর্জন বাংলাদেশের দ্বীনি শিক্ষা অঙ্গনের জন্য এক গৌরবময় সংযোজন।
রবিবার (৮ মার্চ) আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক থিওলোজি অনুষদের ইমাম যাহাবি (রহ.) হলরুমে অনুষ্ঠিত হয় তাঁর পিএইচডি থিসিসের ডিসকাশন সেমিনার। উলুমুল হাদিস বিভাগের এই গবেষণা উপস্থাপনায় প্রধান পরীক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট হাদিস গবেষক অধ্যাপক ড. সুবহি আব্দুল ফাত্তাহ রাবি এবং ড. মুহাম্মাদ নাসর আদ-দাসুকি আল-লাব্বান। থিসিসের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন অধ্যাপক ড. আল-খুশুয়ি মুহাম্মাদ আল-খুশুয়ি এবং অধ্যাপক ড. ইমাদ আস-সাইয়্যিদ মুহাম্মাদ ইসমাইল আশ-শিরবিনি। এছাড়া উসুলুদ্দিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মাহমুদ মুহাম্মদ হুসাইনসহ বিভিন্ন অনুষদের অধ্যাপক ও দেশি-বিদেশি বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে সেমিনারটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
ড. মুশাররাফ হুসাইনের গবেষণার বিষয় ছিল—
«شرح الإمام الزرقاني على المواهب اللدنية للقسطلاني – دراسة وتحقيق: من أول غزوة بني لحيان إلى آخر غزوة خيبر»
যেখানে ইমাম কাসতাল্লানি রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়াহ-এর ওপর ইমাম যুরকানি (রহ.)-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের গবেষণামূলক বিশ্লেষণ ও সমালোচনামূলক সম্পাদনা উপস্থাপন করা হয়।
গভীর গবেষণা, বিশ্লেষণী দক্ষতা ও সাবলীল উপস্থাপনায় পরীক্ষকবৃন্দ সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং তাঁকে “মারতাবাতুশ শরাফিস সানিয়া” বা “জাইয়্যিদ জিদ্দান (Very Good)” গ্রেডে উত্তীর্ণ ঘোষণা করেন।
১৯৭৪ সালে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর এক ঐতিহ্যবাহী ইলমি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ড. মুশাররাফ হুসাইন। তিনি বাংলাদেশের প্রখ্যাত দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা আব্দুল হামিদ (রহ.)-এর প্রপৌত্র। পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় শৈশব থেকেই তাঁর মাঝে জ্ঞানচর্চার গভীর অনুরাগ গড়ে ওঠে।
তিনি ১৯৯৬ সালে হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন এবং ১৯৯৭ সালে তাফসীর ও উলুমুল কুরআনে তাখাসসুস অর্জন করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালে ভারতের দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা, লখনৌ থেকে ‘আল-আলিমিয়্যাহ’ ডিগ্রি লাভ করেন।
২০১৩ সালে আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উলুমুল হাদিস বিভাগে মাস্টার্স সম্পন্ন করার পর দীর্ঘ গবেষণা সাধনার মাধ্যমে এবার একই বিভাগ থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি হাটহাজারী মাদ্রাসার উলুমুল হাদিস, দাওয়াহ ও ইরশাদ বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদ্রাসা ও নানুপুর উবাইদিয়া মাদ্রাসায়ও অধ্যাপনা করেছেন।
মিশরে অবস্থানকালে তিনি বাংলাদেশি ছাত্রসমাজের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তিনি আযহার ওয়েলফেয়ার সোসাইটি বাংলাদেশ, মিশর-এর প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম। এছাড়া বাংলাদেশি ছাত্র সংগঠন ইত্তিহাদ-এর ২০০৫–২০০৬ সেশনে প্রচার সম্পাদক এবং ২০০৭–২০০৮ সেশনে সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ড. মুশাররাফ হুসাইনের এই অর্জনে মিশরে বাংলাদেশি কওমি শিক্ষার্থীদের সংগঠন আযহার ওয়েলফেয়ার সোসাইটি বাংলাদেশ তাঁকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তাঁর এই সাফল্য বাংলাদেশের ছাত্রসমাজের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস।
নিজের প্রতিক্রিয়ায় ড. মুশাররাফ হুসাইন বলেন,
জ্ঞান অর্জন কোনো নির্দিষ্ট বয়সের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘ সাধনা ও প্রচেষ্টার পর জীবনের এই সময়ে এমন সাফল্য অর্জন মহান আল্লাহ তাআলার বিশেষ দয়া ও অনুগ্রহ।
